
জিয়া হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে
রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, মূলত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বিশেষত প্রগতিশীল অংশকে আরও কোণঠাসা এবং বাকি সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করতেই পরিকল্পিতভাবে এই অভ্যৃত্থান সংঘটন করা হয়।

ভোটের প্রচারে দেশ এখন সরগরম। টিভি খবর, পত্রিকা খুললেই দেখা যায় দলীয় প্রার্থী, নির্দলীয় প্রার্থীরা সবাই ব্যস্ত নিজ নিজ প্রচারণায়। নির্বাচন কমিশন আরোপিত নিষেধাজ্ঞা সবটা না হলেও অনেকটাই মানা হচ্ছে, ফলে পোষ্টার, ব্যানার ইত্যাদি শহর অঞ্চলকে ঢেকে দিতে পারেনি; দেয়াল, রাস্তা, বাজার, ঘাট ইত্যাদি এখনো অনেকটা পরিষ্কার। সামান্য হলেও সভ্য করা গেছে দলীয় নেতা, কর্মীদের। তবে খোঁচাখুচি, মারামারি, আক্রমণাত্মক কথা, অপ্রিয় সমালোচনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
বড় দলগুলোর নেতারা ভালই জানেন যে এমন দাঙ্গাবাজি বেশি বাড়তে দেওয়া যাবে না, বাড়লে সবার জন্যই তা হবে আত্মহত্যার সামিল। তাদের কারণেই পতিত স্বৈরাচারের স্বপ্ন সফল হবে। কিন্তু তারপরেও নিজ নিজ দলের কিছু নেতা কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না, এ যে দীর্ঘদিনের অভ্যাস যা শরীরের রক্ত কণিকায় জমা হয়ে আছে; ঘষিলে, মাজিলেও এই চরিত্র সহজে যাবে না।
কিন্তু এমন ভোট প্রচারের ফলাফল কি হতে পারে তা নিয়ে চলছে ব্যাপক জল্পনা, কল্পনা! কোন দল কেমন সংখ্যক আসনে জয়লাভ করতে পারে?
ঐতিহাসিক প্রবণতা দেখলে একবাক্যে সবাই বলবে যে বিএনপি জোট এই ভোটে ব্যাপক জয়লাভ করবে, কিন্তু ইতিহাস তো পরিবর্তনশীল, আমাদের মনের মত স্থির দাঁড়িয়ে থাকে না। এর কিছু আলামত পাওয়া গেছে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোতে। সেসব নির্বাচনে ছাত্র শিবিরের জয়লাভ গণমনে নতুন ধ্যান ধারণার ইঙ্গিত দেয়। শিবির কি ওসব নির্বাচনে টাকা বা লাঠি ব্যবহার করে জয়লাভ করেছিল? না এমনটা কোথাও শুনিনি। তারা কি হিন্দু বা অন্যান্য সংখ্যালঘু বিরোধী প্রচারণা চালিয়েছিল; না তেমনটা শোনা যায়নি, বরং তারা সেসব অংশের প্রতিনিধিদেরও সাথে নিয়ে যাকে বলা যায় অংশগ্রহণমূলক-তেমন নির্বাচনই করেছে। তারপরেও গণমানুষের এই শিক্ষিত অংশ ১৯৭১ এর ইতিহাসে আটকে না থেকে তাদের ভোট দিয়েছে, অনেক ভাল, প্রগতিশীল দাবীদারদের, বা বড় সংগঠন এবং ছাত্রদলকে দেয়নি! এটা কী শিক্ষা দেয়? এ থেকে কি শিক্ষা নেবার কিছু আছে? নেওয়া হয়েছে?
বিপরীত মেরুর জামাত-শিবিরের অবস্থা দেখে মনে হয় যে তারা কিন্তু কিছুটা হলেও শিক্ষা নিয়েছে, ঠিক আগের মত নাই। তারা সংখ্যালঘুদের ব্যাপারে তাদের দৃষ্টিভঙ্গী পাল্টেছে, এবং মনে করে যে ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে এদেশের সব নাগরিকের ধর্ম করাসহ সব ব্যাপারে সমান অধিকার। তাই তারা পূজামণ্ডপেও ইদানিং পাহারা দেয়, অন্যরা গোলযোগ করে যেন তাদের উপরে দোষারোপ না করতে পারে।
তবে দলটি এখনো নারীদের সমান অধিকারের ব্যাপারে একমত নয়, কিন্তু তাদের রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার, পড়াশোনা, চাকুরিতে অংশ নেওয়ার পক্ষে। তবে এসব ব্যাপারে তাদের সব কিছু এখনো পরিষ্কার নয়। তবে পরিবর্তন যে হচ্ছে এবং হবে তা পরিষ্কার। পরিবর্তন মানেই মৌলবাদ থেকে বেরিয়ে আসা।
কিন্তু তাদের প্রতিপক্ষের পরিবর্তন কিন্তু অতটা পরিষ্কার নয়। বিএনপির তরুণ নেতা তারেক রহমানের বেশ কিছু কথা, কর্মসূচি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বেশিরভাগ মানুষ সে সবকে স্বাগত জানিয়েছে। কিন্তু একটা বিষয়ে সন্দেহ রয়ে যাচ্ছে, বিএনপির যে সাংগঠনিক বাস্তবতা এবং যেসব পুরনো চিন্তার নেতারা রয়ে গেছেন, তারা, তাদের ছোট-নেতা, কর্মীদের চরিত্রের যে সামগ্রিক অবস্থা সেসবের পরিবর্তন না হলে তারেক রহমান বা সৎ নেতা হিসেবে পরিচিত মহাসচিব মির্জা আলমগীর পার্টির জনপ্রিয়তা কি ধরে রাখতে পারবেন? সারা দেশের নিম্নস্তরে, মাঠ পর্যায়ের গণমানুষের আস্থা, ভালবাসা কি থাকবে?
ইতিমধ্যেই চাঁদাবাজি–দখলবাজির কারণে বিএনপির তৃণমূলের নেতা–কর্মীদের বদনাম হয়েছে। এই ঘটনাগুলো দলের ভাবমূর্তি কিছুটা হলেও ম্লান করে দিচ্ছে। ভোটের মাঠে সেটা কীভাবে উদ্ধার করবে সেটাই বিএনপির বড় চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরাও জয়ের পথে কাঁটা হয়ে দেখা দিতে পারে।
এর বাইরে আছে ছোট ছোট বাম–ডান ও তরুণদের নতুন দল। এরা বুঝে নিয়েছেন যে তাদের পক্ষে এককভাবে আসন পাওয়া সম্ভব নয়, তাই তারা এই দুই বড় জোটের সঙ্গী হয়েছেন, বা নিজেরা আলাদা জোট করেছেন–সেটা কতটা আদর্শগত আর কতটা কৌশলগত তা পরিষ্কার নয়! এসব ঘটনার আলামত ও মাঠ পর্যায়ের ভোটের চিত্র বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হতে পারে। কিন্তু সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা ১৯৯১ ও ১৯৯৬ এর মতো হলে ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হবে। চরচার সঙ্গে আলাপে প্রবাসী সাংবাদিক জুলকার নাইন সায়ের বলেছেন, একটি পক্ষ ঝুলন্ত পার্লামেন্টের পক্ষে তৎপরতা চালাচ্ছে।
উল্লেখ্য, ১৯৯১ সালে বিএনপি ও ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জিতলেও এককভাবে গঠন করতে পারেনি। অন্যদের সহযোগিতা নিতে হয়েছে। আবার কোনো কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, আওয়ামী লীগ বিহীন এই নির্বাচনে মাঠ পুরোপুরি বিএনপির পক্ষে। কিন্তু তারা সেই সুফল ঘরে তুলতে পারবে কি না সেই প্রশ্ন আছে। তবে শহরে তাদের প্রতিপক্ষের যেই সাংগঠনিক তৎপরতা, গ্রামাঞ্চলে তার চেয়ে অনেক কম। এটাই হয়তো বিএনপিকে সুবিধা দিতে পারে।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ নির্বাচনী মাঠে নেই কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায়। দলের প্রবাসী নেতৃত্ব ভোট বর্জনের আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু দেশের ভেতরে নানাভাবে চাপে থাকা দলের তৃণমূলের নেতা কর্মীরা আদৌ সেই আহবাান সাড়া দেবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। যেই নেতৃত্ব সাধারণ নেতা–কর্মীদের ফেলে নিরাপদ আশ্রয়ে গিয়েছেন, তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আরও বিপদ ডেকে আনবে কেন?
সৈয়দ তারিক উজ জামান: গবেষক ও লেখক

রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, মূলত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বিশেষত প্রগতিশীল অংশকে আরও কোণঠাসা এবং বাকি সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করতেই পরিকল্পিতভাবে এই অভ্যৃত্থান সংঘটন করা হয়।

এখানে ধর্ম, ভাষা ও জাতিসত্তার পাশাপাশি দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক ভূখণ্ডকে সবচেয়ে বড় করে দেখা হয়েছে। শহীদ জিয়ার এই সংক্ষিপ্ত অথচ শক্তিশালী কথাগুলোই আজ যেন আমাদের পথ চলার প্রেরণার উৎস।

জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা সংহতকরণের এই পথ মৃসণ ছিল না। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর ৯ অক্টোবর থেকে তার বিরুদ্ধে একের পর এক সামরিক অভ্যুত্থানের (ক্যু) চেষ্টা হয়।

যে মানুষ বৈধ কাগজপত্র না থাকা সত্ত্বেও জীবিকার তাগিদে ভারতে গেছেন, ভারত সরকার না হয় তাদের দায়িত্ব অস্বীকার করল। কিন্তু যারা ভারতে জন্ম নিয়েছেন, তাদের কোন আইনে তারা ফেরত পাঠাবে?