
জিয়া হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে
রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, মূলত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বিশেষত প্রগতিশীল অংশকে আরও কোণঠাসা এবং বাকি সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করতেই পরিকল্পিতভাবে এই অভ্যৃত্থান সংঘটন করা হয়।

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনুকে হত্যা করা হয় ২০১৬ সালের ২০ মার্চ। ১০ বছরেরও বেশি সময় আগে। এই দীর্ঘ সময়ে তনুর মা দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন মেয়ে হত্যার বিচারের দাবিতে। বিচারের বাণী এতদিন নিভৃতে কাঁদলেও সম্প্রতি সুড়ঙ্গের শেষে আলোক রেখা দেখা যাচ্ছে। আসামিদের মধ্যে অন্তত একজন ধরা পড়েছে।
তনু পড়াশোনার পাশাপাশি সংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। গান গাইতেন, নাটক করতেন। কেবল স্বজন নয়, সহপাঠী ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সহযাত্রীরাও তার বিচারের দাবিতে কুমিল্লায় নানা কর্মসূচি পালন করেছেন। ২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে একটি বাসায় টিউশনি করতে গিয়ে আর বাড়ি ফেরেননি তনু। পরে সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসের অদূরে ঝোপের মধ্যে তার লাশ পাওয়া যায়।
তনু হত্যার পর ৮ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছির। কিন্তু তারা আসামিদের ধরার প্রয়োজন বোধ করেনি। বরং প্রভাবশালী মহল থেকে তনু হত্যার বিচারের বদলে তার ভাইকে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসেও মামলার তদন্তে কোনো অগ্রগতি হয়নি, আসামিও ধরা পড়েনি। ধরা পড়লেন বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর গত ২১ এপ্রিল। তবে একজন আসামি ধরা পড়াই যথেষ্ট নয়। তনু হত্যার বিচার করতে হলে সব আসামিকে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
তনু হত্যার দায়ে যে আসামি গ্রেপ্তার হলেন, তার নাম হাফিজুর রহমান। তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা। তনু হত্যার সময় তিনি ছিলেন কুমল্লা সেনা নিবাসের জ্যেষ্ঠ ওয়ারেন্ট অফিসার। ২০২৩ সালে অবসর নেওয়ার পর ঢাকার কেরানীগঞ্জে বসবাস করছিলেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে সেখান থেকেই গ্রেপ্তার করে। আদালতে হাজির করার আগে ঢাকায় সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে তার ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম পত্রিকান্তরে বলেন, “অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য হাফিজুর রহমানকে তিন দিনের রিমান্ডে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা গেছে। আমরা সেগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখছি। পরবর্তী সময়ে প্রয়োজন হলে আবারো আদালতে রিমান্ড আবেদন করা হবে। আদালতের নির্দেশে তাকে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে।”
ইতিমধ্যে হাফিজুরকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে আদালতের নির্দেশে। তনু হত্যার অপর দুই আসামি হলেন কুমিল্লা সেনানিবাসের সাবেক সার্জেন্ট জাহিদ ও সৈনিক শাহীন আলম। তারা বর্তমানে অবসরে আছেন। অবশ্য মামলার বাদী তনুর বাবা ইয়ার হোসেন বলেছেন, সৈনিকের নাম শাহীন আলম নয়, জাহিদ।
তনু হত্যার ঘটনাটি সে সময় কেবল কুমিল্লা নয়, সারাদেশেই চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। সেনানিবাসের ভেতরে একটি মেয়ে নেই হয়ে গেলেন, আর সেখানকার কর্মকর্তারা কেউ জানলেন না, অপরাধীকে খুঁজে বের করা গেল না, এটা নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একই সময়ে চট্টগ্রামে মিতু নামে আরেক গৃহবধূ খুন হন। তারও আগে ঢাকায় নিহত হন সাংবাদিক সাগর–রুনি দম্পতি। মিতু হত্যার সঙ্গে তার পুলিশ কর্মকর্তা স্বামীর জড়িত থাকার খবরও সে সময় প্রকাশিত হয়। অনেক নাটকীয়তার পর আসামি গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন।

২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে আমি কুমিল্লায় তনুর মা আনোয়ারা বেগমের সাক্ষাৎকার নিতে যাই। সে সময় নিজেকে অপরাধী মনে হয়েছিল। বারবার মনে হচ্ছিল–আমরা এমন এক সমাজে বাস করি, যেখানে সুরক্ষিত সেনানিবাসের মধ্যে কলেজপড়ুয়া একটি মেয়েকে হত্যা করা হলো; কিন্তু থানা-পুলিশ কিংবা সেনানিবাস কর্তৃপক্ষ এর হদিস দিতে পারল না। তনুর মা আনোয়ারা বেগম সেদিন আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “এত কষ্ট করে মেয়েকে মানুষ করলাম। কিন্তু মেয়েটাকে এভাবে মেরে ফেলল। গত সাত মাসে আমি এমন দিন নেই যে, মেয়ের কথা মনে করে কাঁদিনি।” পাশে বসা ছোট ছেলেকে দেখিয়ে তিনি বলেন, “ওরা যাতে না দেখে, এ জন্য আমার রুমে গিয়ে একা একা কান্দি। এই সাত মাস আমার কাছে সাত বছরের মতো লাগছে।”
তনু মারা যাওয়ার পর তার বাবা সেই শোক সইতে না পেরে স্ট্রোক করেন। মায়ের আক্ষেপ, “মেয়েটারে মারল কেন? মেয়েটাকে যদি ওদের এতই খারাপ লাগত, ক্যান্টনমেন্ট থেকে বাইর কইরা দিত। আমি সরকারের কাছে বিচার চাই, দেশবাসীর কাছে বিচার চাই।”
তনুর কথা বলতে গিয়ে মা মাঝেমধ্যেই খেই হারিয়ে ফেলেন। চোখের পানি মোছেন; কিন্তু ভেঙে পড়েন না। মনকে শক্ত রাখেন।
তনু যখন কলেজে পড়েন, তখন বাবা-মায়ের কষ্ট বুঝতে পেরে টিউশনি করতেন। নিজে টাকা জমাতেন। মা বললেন, “তনু নিজের খরচ জোগাতে বাসায় টিউশনি করত। কিন্তু একদিন প্রতিবেশী এক নারী এসে বললেন, ‘সোহাগী, তুমি অনেক ছেলেমেয়ে মানুষ করছ, আমার মেয়েটারে পড়াও।’ কিন্তু ও রাজি না হলে তিনি বলেন, ‘যেদিন তুমি অবসর পাও সেদিন যাইও।’ সেই থেকে তনুর বাইরে টিউশনি করা।”
মাত্র ২ মাস ২০ দিন বাইরে টিউশনি করেছেন তনু। ঘটনার দিন বিকেল ৪টার দিকে বাসা থেকে বের হয়ে আর ফিরে আসেননি। মায়ের ধারণা, ওই নারীই তনুকে হত্যায় সহযোগিতা করেছেন।
দুর্বৃত্তদের হাতে তনু খুন হওয়ার আগের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে আনোয়ারা বেগম বলেন, “ওই দিন ও খুব হাসতে ছিল। আমি রাগ করে বলি, অত হাসছ কেন? অন্যদিন হলে আমার গলা জড়িয়ে ধরত। সেদিন একা একা বলতে থাকে, আজ কেন যেন মায়ের মনটা খারাপ। যাওয়ার সময় বলল, ‘আপনি আনতে যাইয়েন না।’ আমি সন্ধ্যার আজান দেওয়ার পর গেছি। দেখি কারেন্ট নাই। অন্যদিন সাতটায় ফোন দেয়। টিভিতে আটটার খবর যখন হয়, তখন আমি চিৎকার দিয়ে উঠি, রুবেলরে রুবেলরে (আনোয়ারের ডাকনাম), আমার সোহাগী শেষ। এরপর দেবরের মেয়েকে নিয়ে বের হই। কিন্তু রাস্তায় লোকজন ছিল না। আমি কালভার্টের ওপর বসে পড়ি।”
আনোয়ারা বেগম ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, “অনেকে ছেলেকে চাকরি দেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু মেয়ের হত্যার বিচার থেকে কি আমার চাকরিটা বেশি? আমার ছেলে বেকার বা কানা না। একটা কিছু করে খাইতে পারবে। আমি মেয়ের হত্যার বিচার চাই।”
সন্তানহারা একজন মা যে মনের দিক থেকে কত শক্ত থাকতে পারেন, তা আনোয়ারা বেগমকে দেখলে বোঝা যায়। নানা মহলের ভয়ভীতি উপেক্ষা করে তিনি তনু হত্যার বিচারের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন, সমাবেশে কথা বলেছেন। তিনি জানেন সন্তানকে আর ফিরে পাবেন না। কিন্তু তার দুটি চাওয়া–তনুকে যারা খুন করেছে, তাদের শাস্তি এবং ভবিষ্যতে যেন কারো সন্তান অপঘাতের মারা না যায়।
আজ ১০ বছর পরও আনোয়ারা বেগমের কান্নাভেজা কণ্ঠ কানে বাজে, “ওরা কেন তনুকে মেরে ফেলল?” এ রকম কত তনু, কত মিতু, কত সাগর–রুনি হারিয়ে গেল। আর ঘাতকেরা থেকে যায় আইন ও বিচারের বাইরেই।
লেখক: সম্পাদক, চরচা

রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, মূলত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বিশেষত প্রগতিশীল অংশকে আরও কোণঠাসা এবং বাকি সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করতেই পরিকল্পিতভাবে এই অভ্যৃত্থান সংঘটন করা হয়।

এখানে ধর্ম, ভাষা ও জাতিসত্তার পাশাপাশি দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক ভূখণ্ডকে সবচেয়ে বড় করে দেখা হয়েছে। শহীদ জিয়ার এই সংক্ষিপ্ত অথচ শক্তিশালী কথাগুলোই আজ যেন আমাদের পথ চলার প্রেরণার উৎস।

জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা সংহতকরণের এই পথ মৃসণ ছিল না। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর ৯ অক্টোবর থেকে তার বিরুদ্ধে একের পর এক সামরিক অভ্যুত্থানের (ক্যু) চেষ্টা হয়।

যে মানুষ বৈধ কাগজপত্র না থাকা সত্ত্বেও জীবিকার তাগিদে ভারতে গেছেন, ভারত সরকার না হয় তাদের দায়িত্ব অস্বীকার করল। কিন্তু যারা ভারতে জন্ম নিয়েছেন, তাদের কোন আইনে তারা ফেরত পাঠাবে?