বারবার ফোন চেক করার অভ্যাস কোনোভাবে থামাতে পারছেন না? অনেকের কাছে এটি সাধারণ অভ্যাস মনে হলেও কিন্তু ধীরে ধীরে এটি আসক্তিতে পরিণত হতে পারে।
এই অভ্যাস কাটিয়ে ওঠার জন্য এক প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞদের কিছু বাস্তবসম্মত পরামর্শ তুলে ধরেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস।
ফোন আসক্তি কী?
মনোবিদদের ভাষ্য, মস্তিষ্ক যখন অস্বস্তি এড়াতে ফোনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন তাকে ফোন আসক্তি বলে। তখন চাপ, একঘেয়েমি বা একাকীত্ব মোকাবিলার সবচেয়ে সহজলভ্য উপায় হয়ে ওঠে ফোন। এ থেকে যত বেশি স্বস্তি পাওয়া যায়, ততই মস্তিষ্ক এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। একসময় এটি স্বয়ংক্রিয় অভ্যাসে পরিণত হয়। চিন্তা না করেই মানুষ ফোন হাতে তুলে নেয়, যদিও তা বাস্তব জীবন থেকে তাকে দূরে সরিয়ে দেয়।
কখন এটি সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু লক্ষণ দেখলে বোঝা যায় বিষয়টি সমস্যা হয়ে উঠছে। যেমন:
- কোনো কাজের মাঝখানে ফোন খুলে আগের কাজ ভুলে যাওয়া
- মানসিক চাপ বা অতিরিক্ত উত্তেজনা অনুভব করলে স্ক্রল করা
- ঘুম থেকে উঠেই ফোন চেক করা
- ব্যবহার না করলেও সবসময় সঙ্গে রাখা
- নীরব মুহূর্তেও অকারণে ফোন দেখা
- কথোপকথনের সময় ফোন হাতে নেওয়া
- ফোন কাছে না থাকলে অস্থিরতা অনুভব করা
থামানো কঠিন কেন?
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের মস্তিষ্ক দ্রুত অস্বস্তি কমাতে চায়, আর ফোন কয়েক সেকেন্ডেই তাৎক্ষণিক স্বস্তি দেয়। ফলে এটি দ্রুততম সমাধান হিসেবে অভ্যাসে পরিণত হয়।

ফোন ব্যবহারের এই অভ্যাস যত বেশি কাজ করে, মস্তিষ্ক তত দ্রুত একটি ‘শর্টকাট’ তৈরি করে ফেলে। যেমন:
একঘেয়েমি লাগলে উদ্দীপনা পেতে ফোন খোলা, উদ্বেগে স্ক্রল করে নিজেকে স্থির করা, একাকীত্বে নোটিফিকেশন দেখে সাময়িক স্বস্তি পাওয়া কিংবা ক্লান্তিতে ফোনে সময় কাটিয়ে দ্রুত শক্তি পাওয়ার চেষ্টা–এভাবেই গড়ে ওঠে আসক্তির চক্র।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে তাৎক্ষণিক স্বস্তি মিললেও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি হয়।
মস্তিষ্ক ও শরীরে প্রভাব
সাইকো থেরাপিস্টদের মতে, অতিরিক্ত ফোন ব্যবহার মস্তিষ্ক ও শরীরে বাস্তব ও পরিমাপযোগ্য ক্ষতি করে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- চিন্তার গতি কমে যায়, অতিরিক্ত এক ঘণ্টা ব্যবহারও প্রভাব ফেলতে পারে
- মনোযোগ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত মস্তিষ্কের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়
- স্বল্পমেয়াদি স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে
- মস্তিষ্ক সবসময় সক্রিয় অবস্থায় থাকে, ফলে বিশ্রাম নেওয়া কঠিন হয়
- ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হয়
- ঘাড়ে ব্যথা, মাথাব্যথা ও চোখে ক্লান্তি তৈরি হয়
কীভাবে এই চক্র ভাঙবেন
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, ফোন যত কাছে থাকবে, তত দ্রুত তা হাতে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। তাই কিছুটা দূরত্ব তৈরি করাই প্রথম ধাপ। এরজন্য যা করা যেতে পারে–
- কাজের সময় ফোন অন্য কক্ষে রাখা
- খাওয়ার সময় ড্রয়ারে রাখা
- হাঁটার সময় পকেটে রাখা
- কারো সঙ্গে থাকলে চোখের আড়ালে রাখা
- টিভি দেখার সময় দূরে রাখা
- একঘেয়েমি লাগলে কিছুক্ষণ তা সহ্য করার চেষ্টা করা

অভ্যাস বদলের আরও উপায়
বিশেষজ্ঞরা জানান, ঘুম থেকে ওঠার পর মস্তিষ্ক এমন এক অবস্থায় থাকে, যখন নতুন অভ্যাস গড়ে তোলা সহজ। তাদের পরামর্শ:
- ঘুম থেকে উঠে ফোন ব্যবহার না করে শরীরচর্চা বা শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করুন
- বেশি ব্যবহৃত অ্যাপগুলো শেষ পেজে সরিয়ে রাখুন
- ফোন গ্রেস্কেল মোডে ব্যবহার করুন
- স্ক্রিন টাইমের জন্য পাসকোড ব্যবহার করুন
- প্রতিদিন অ্যাপ থেকে লগ আউট করুন
- অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ মুছে ফেলুন
- সময় দেখার জন্য ঘড়ি ব্যবহার করুন
দুই সপ্তাহের রিসেট পদ্ধতি
সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে নয়, বরং ১৪ দিনের নিয়ন্ত্রিত অভ্যাসই যথেষ্ট বলে মনে করেন মনোবিদরা। প্রতিদিন ৩০ মিনিটের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সীমাবদ্ধ থাকলে মেজাজ, ঘুম, মনোযোগ উন্নত হয়।
এজন্য প্রতিদিন কতবার ফোন ধরছেন, কখন ঘুমাতে যাচ্ছেন এবং কেমন লাগছে–তা লিখে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ১৪ দিন পর নিজের পরিবর্তন তুলনা করলে ইতিবাচক ফল স্পষ্ট হবে।