মূত্রনালীর পাথর বা ইউরেটেরাল স্টোন একটি জটিল স্বাস্থ্যসমস্যা, যা বিশ্বজুড়ে প্রতি ১০ জনে প্রায় ১ জনকে প্রভাবিত করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাসে কিছু পরিবর্তন আনলে এ ধরনের পাথরের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
আমেরিকার ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের ওয়েবসাইটের এক প্রতিবেদনে এই সমস্যার কারণ ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ তুলে ধরা হয়েছে।
মূত্রনালীর পাথর হলো কিডনিতে তৈরি হওয়া পাথর, যা কিডনি থেকে মূত্রথলিতে যাওয়ার নালীর (ইউরেটার) কোনো এক স্থানে আটকে যায়। ইউরেটার হলো পেশিবহুল নালী, যা কিডনিকে মূত্রথলির সঙ্গে সংযুক্ত করে। মানুষের উচ্চতার ওপর নির্ভর করে ইউরেটারের দৈর্ঘ্য সাধারণত ১০ থেকে ১২ ইঞ্চি হয় এবং প্রতিটি কিডনির জন্য একটি করে ইউরেটার থাকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূত্রনালীর পাথর বা ক্যালকুলাস হলো অস্বাভাবিক আকারের কঠিন বস্তু, যা প্রস্রাবে থাকা স্ফটিক, খনিজ ও লবণ জমে তৈরি হয়। কিছু পাথর প্রসাবের সময় বাধা সৃষ্টিসহ তীব্র ব্যথার কারণ হতে পারে। এই পাথর কিডনির কেন্দ্রে অবস্থিত রেনাল পেলভিসের কাছে দেখা যেতে পারে, যেখানে প্রস্রাব জমা হয়। আবার ইউরেটারের মাঝামাঝি অংশ বা মূত্রথলির সংযোগস্থলেও পাথর অবস্থান করতে পারে।
ইউরেটেরাল পাথরের আকার বিভিন্ন হতে পারে। খুব ছোট পাথর (যা খালি চোখে দেখা যায় না) সাধারণত প্রস্রাবের সঙ্গে বের হয়ে যায় এবং কোনো সমস্যা সৃষ্টি করে না। তবে পাথর যত বড় হয়, স্বাভাবিকভাবে বের হওয়ার সম্ভাবনা তত কমে এবং উপসর্গ দেখা দেওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

যেসব উপসর্গগুলো দেখা দিতে পারে–
- পিঠের নিচের দিকে ও পাঁজরের নিচে তীব্র ব্যথা
- ব্যথা নিচের পেটের দিকে ছড়িয়ে পড়া
- প্রস্রাবের সময় ব্যথা বা জ্বালাপোড়া
- বমি বমি ভাব ও বমি
- রক্তমিশ্রিত বা অস্বাভাবিক রঙের প্রস্রাব (বাদামি, গোলাপি বা লাল)
- ঘোলাটে প্রস্রাব
- ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ
- অল্প পরিমাণ প্রস্রাব হওয়া
পাথরের সঙ্গে যদি মূত্রনালীর সংক্রমণ থাকে, তবে জ্বর, কাঁপুনি বা অসুস্থ বোধও হতে পারে।
এই সমস্যা কেন হয়
প্রস্রাবে পাথর তৈরির উপাদান (স্ফটিক) বেশি পরিমাণে জমে গেলে এবং প্রস্রাবের পরিমাণ কম থাকলে পাথর তৈরি হয়। পর্যাপ্ত পানি পান করলে এসব উপাদান পাতলা হয়ে যায় এবং পাথর গঠনের ঝুঁকি কমে।
মূত্রনালীর পাথরে যে কেউ আক্রান্ত হতে পারেন। তবে কিছু ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি থাকে। যেমন–
- পুরুষদের ক্ষেত্রে (তবে নারী ও শিশুরাও আক্রান্ত হতে পারে)
- বয়স ৪০ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে হলে
- আগে কিডনিতে পাথর হওয়ার রেকর্ড থাকলে
- পরিবারে কারো এই সমস্যা থাকলে
- পর্যাপ্ত প্রস্রাব না হলে (যা পানি পান, ঘাম ও শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে)
- টাইপ-২ ডায়াবেটিস থাকলে
- বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) ৩০-এর বেশি হলে
- দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়াজনিত রোগ যেমন ক্রোনস ডিজিজ বা আলসারেটিভ কোলাইটিস থাকলে
- পলিসিস্টিক কিডনি রোগ থাকলে

ঝুঁকি কমানোর উপায়
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাসে কিছু পরিবর্তন আনলে এ ধরনের পাথরের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
নিচে ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের ডাক্তারদের কিছু পরামর্শ তুলে ধরা হলো–
- বেশি করে তরল পান করতে হবে। প্রতিদিন অন্তত ৩ লিটার পানি বা তরল গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পানি সবচেয়ে ভালো, তবে লেবুর শরবত বা কমলার রসও উপকারী।
- প্রাণিজ প্রোটিন (মাংস, ডিম, মাছ) কম খেতে হবে, কারণ এগুলো শরীরে ইউরিক অ্যাসিড বাড়ায়। এর বিকল্প হিসেবে ডাল, শিম, মটরশুঁটি খাওয়া যেতে পারে।
- লবণ (সোডিয়াম) গ্রহণ সীমিত করুন। প্রতিদিন এক হাজার ৫০০ মিলিগ্রামের কম লবণ গ্রহণ পাথর হওয়ার ঝুঁকি কমায়। খাবারে লবণের পরিবর্তে ভেষজ, মসলা, লেবুর রস বা ফ্লেভারযুক্ত ভিনেগার ব্যবহার করা যেতে পারে।
- অক্সালেটযুক্ত খাবার কম খেতে হবে। পালং শাক, কাঠবাদাম, কাজুবাদাম ও আলুতে অক্সালেট বেশি থাকে। ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার ও পানীয় অক্সালেটের স্ফটিক হওয়া প্রতিরোধে সাহায্য করে।