কিছু মহলে আশাবাদ প্রকাশ করা হচ্ছে বটে, তারপরও বলা এখনই আগাম হয়ে যাবে যে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এরই মধ্যে থমকে গেছে বা সংকটটি খুব শিগগিরই আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার মাধ্যমে সমাধান হয়ে যাবে। পরিস্থিতি এখনো অস্থির এবং ইরান রাষ্ট্রের টিকে থাকাটা এখনো পরীক্ষার মুখে রয়েছে। তবুও এই প্রাথমিক পর্যায়েই সংঘাতটি আরও গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করছে–বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কী হবে। এটা বোঝা যাবে, যখন বৈশ্বিক আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তাদের সাম্প্রতিক প্রচেষ্টা শেষ হবে।
যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক রাজনীতি থেকে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে–এমন তো নয়। আমেরিকার পতনের যে সব কল্পচিত্র আঁকা হয়, তা মূলত কল্পনার জগতের বিষয়। রাশিয়া, চীন, ভারত এবং অন্যান্য প্রধান শক্তির জন্য আসল প্রশ্ন এটি নয় যে, যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক রাজনীতিতে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে যাবে কি না। বরং প্রশ্ন হলো, পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় সে কীভাবে নিজেকে মানিয়ে নেবে।
রাশিয়ার জন্য এই প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র এখনো পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী উপাদান, যার সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে একদিকে ঘনিষ্ঠ, অন্যদিকে সংঘাতপূর্ণ। ভূগোল ও ইতিহাস নিশ্চিত করে যে, আমাদের কৌশলগত হিসাব-নিকাশে সবসময়ই পশ্চিম ইউরোপ ও আমেরিকাকে বিবেচনায় নিতে হবে। অতএব রাশিয়াকে সতর্কভাবে ভাবতে হবে ভবিষ্যতের শক্তির ভারসাম্যে যুক্তরাষ্ট্রকে কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, যাতে তা আমাদের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
ইরানের ওপর সাম্প্রতিক হামলাকে ঘিরে যে ঘটনাগুলো ঘটছে, সেগুলো হয়তো একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করছে। এগুলো এমন এক বিশ্বে আমেরিকান শক্তির সীমা উন্মোচন করেছে, যে বিশ্ব আর একতরফা নেতৃত্ব মেনে নিতে প্রস্তুত নয়, কিংবা সক্ষমও নয়। ইরান কতদিন ধারাবাহিক সামরিক চাপ সহ্য করতে পারবে, বাইরের অংশীদারদের কাছ থেকে কতটা সহায়তা পাবে এবং ওয়াশিংটন নিজেই কতদিন এমন একটি অভিযান চালিয়ে যেতে প্রস্তুত থাকবে, যা ইতিমধ্যেই তার প্রাথমিক প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে–এসব প্রশ্ন এখনো অনিশ্চিত।
তবে যা ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান, তা হলো একটি পরস্পরবিরোধী চিত্র। ইসরায়েলের নেতৃত্ব সংঘাতকে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে নিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে মনে হচ্ছে। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের সদস্যরা ইরান রাষ্ট্রের টিকে যাওয়ার অপ্রত্যাশিত ক্ষমতায় ক্রমেই বিস্মিত ও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছেন। একই সময় অনেক মার্কিন মিত্রও এই সংঘাতের পরিণতি নিয়ে দৃশ্যত উদ্বিগ্ন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুদ্ধটি ইতিমধ্যেই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গুরুতর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। এই অর্থনৈতিক চাপগুলো ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে–কেন এমন গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে যে, ওয়াশিংটন নীরবে এমন মধ্যস্থতাকারী খুঁজছে, যারা তেহরানের সঙ্গে সংলাপের পথ খুলতে পারে। এই অস্থির পরিবেশে রাশিয়া ইরানের জনগণ ও রাষ্ট্রের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছে, যাদের তারা উসকানিহীন হামলার শিকার বলে মনে করে। একই সঙ্গে মস্কোকে এমন নীতি অনুসরণ করতে হবে, যা তার নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সামরিক শক্তি হিসেবে রাশিয়ার প্রধান উদ্বেগ হলো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় সামগ্রিক শক্তির ভারসাম্য এবং সেই ব্যবস্থার মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র যে বিশেষ স্থান অধিকার করে এসেছে, তা। এই অবস্থানটি বোঝাতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ব্যবহৃত একটি উপমা ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশ্ব রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ‘নিওপ্লাজম’ বা অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধি হিসেবে তুলনা করা যেতে পারে। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো এখানে এমন কোনো ‘টিউমার’-এর অস্তিত্ব নেই, যা পুরো ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে না। বরং এটি সেই ব্যবস্থার বিকাশের মধ্যেই একীভূত হয়ে যায় এবং একটি বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করে। বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে যুক্তরাষ্ট্র যে অসাধারণ অবস্থান অর্জন করেছিল, তা শুধু অপ্রতিরোধ্য শক্তির ফল ছিল না।
এটি ছিল খুব নির্দিষ্ট কিছু ঐতিহাসিক পরিস্থিতির ফল। পশ্চিম ইউরোপ দীর্ঘ যুদ্ধে ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত ছিল, চীন অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মধ্যে ছিল আর সোভিয়েত ইউনিয়ন তার কমিউনিস্ট শাসনে বিশ্বের বাকি অংশ থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন ছিল। এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রকে অসাধারণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নেতৃত্বের অবস্থান নিতে সুযোগ করে দেয়।
কিন্তু এই নেতৃত্ব কখনোই রোমান সাম্রাজ্য বা চেঙ্গিজ খানের সাম্রাজ্যের মতো ক্লাসিক সাম্রাজ্যবাদী বিজয়ের ফল ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের কোনো সিদ্ধান্তমূলক সামরিক বিজয়ের মাধ্যমে পরাজিত করেনি। বরং অন্য শক্তিগুলো যখন নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যায় ব্যস্ত ছিল, তখনই যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে শক্তিশালী অভিনেতা হিসেবে উঠে আসে। এই অর্থে আমেরিকা ছিল কাফেলার ‘শেষ উট’, যে হঠাৎ করে সামনে চলে আসে, যখন অন্যরা পিছিয়ে পড়ে।
কিন্তু আজ সেই ঐতিহাসিক পরিস্থিতি আর নেই, যা আমেরিকার আধিপত্যকে সম্ভব করেছিল। এখন আর এমন কোনো বাস্তব কারণ নেই যে, অন্য শক্তিগুলো পিছিয়ে থাকবে। ফলে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র হয়তো বিশ্ব রাজনীতিতে একটি বেশি ‘স্বাভাবিক’ অংশগ্রহণকারী হয়ে উঠবে, প্রভাবশালী শক্তি নয়। ইরান সংকট এই পরিবর্তনটি স্পষ্ট করে।
অসীম সম্পদ ও সামরিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র সহজে একটি বৃহৎ ও স্থিতিস্থাপক রাষ্ট্রকে দমন করতে পারে না–যদি না সংঘাত পারমাণবিক স্তরে পৌঁছে যায়, যা সব পক্ষের কাছেই অচিন্ত্যনীয়। এই অর্থে ইরানে ট্রাম্পের অভিযান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করতে পারে। এটি বিশ্বকে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, একচ্ছত্র মার্কিন আধিপত্যের যুগ পুনঃস্থাপনের প্রচেষ্টা অর্থহীন।
স্ট্যাচু অব লিবার্টি।
এই শিক্ষা শুধু অন্য দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়; এটি আমেরিকানদের নিজেদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাদের শেষ পর্যন্ত নিজেদের শক্তির সীমা মেনে নিতে হবে এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় একটি নতুন ভূমিকা নির্ধারণ করতে হবে।
তিন শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বৈশ্বিক রাজনীতিতে অংশগ্রহণকারী রাশিয়া এই সীমাবদ্ধতাগুলো ভালোভাবেই বোঝে। অন্য অধিকাংশ বড় শক্তিও তা বোঝে।
শুধু যুক্তরাষ্ট্রই কখনো প্রকৃত অর্থে এই সীমার মুখোমুখি হয়নি। এই কারণেই এখন যে কঠিন শিক্ষা নেওয়া হচ্ছে, তা শেষ পর্যন্ত উপকারী প্রমাণিত হতে পারে। একই সঙ্গে অতিরঞ্জিত বিপর্যয়বাদী চিন্তা এড়িয়ে চলাও গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকান আধিপত্য দুর্বল হলে তা অবধারিতভাবে বৈশ্বিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে–এই ধারণাটি মূলত বিদ্যমান ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য ব্যবহৃত একটি অলঙ্কারমূলক যুক্তি। আরও ভারসাম্যপূর্ণ একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা সম্ভব এবং অনেক দিক থেকে তা কাম্যও।
রাশিয়ার নিজস্ব ইতিহাসই এই বিষয়টি দেখায়। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সূচনালগ্ন থেকেই রাশিয়া প্রায়ই আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ককে নিজের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য পূরণের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।
১৮ ও ১৯ শতকে এই লক্ষ্যগুলো ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল ব্রিটেন-রাশিয়া প্রতিদ্বন্দ্বিতার সাথে। পরে রাশিয়া, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিমুখী সম্পর্ক আন্তর্জাতিক রাজনীতির বৃহত্তর গতিশীলতাকে প্রভাবিত করেছে। আজ নতুন বিন্যাস গড়ে উঠছে। ইউরোপ ও চীনের ওপর আমেরিকার চাপ অনিচ্ছাকৃতভাবে এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থার সৃষ্টি করতে পারে, যেখানে কোনো একক শক্তি অন্যদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করবে না। এমন একটি ফলাফল রাশিয়ার স্বার্থের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
বর্তমান অস্থিরতার সময় থেকে যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত গড়ে উঠবে, তা সম্ভবত আগের ব্যবস্থার তুলনায় অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় ও জটিল হবে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে যুদ্ধ ও সংকট জড়িত থাকতে পারে, কিন্তু এগুলো যেন মূল রূপান্তরকে আড়াল না করে। যদি বিশ্ব এই সমন্বয়ের সময়কালটি বিপর্যয়কর সংঘাত ছাড়া অতিক্রম করতে পারে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবেই থাকবে।
তবে তা এই কারণে নয় যে, বিশ্ব আমেরিকান নেতৃত্বের প্রয়োজন অনুভব করে; বরং এই কারণে যে, অন্য শক্তিগুলো তাদের নিজস্ব কৌশলগত হিসাব-নিকাশে যুক্তরাষ্ট্রকে অন্তর্ভুক্ত করে যাবে। ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় আমেরিকা গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। তবে অবশ্যই আগের মতো আর নয়।
লেখক: ভালদাই ডিসকাশন ক্লাবের প্রোগ্রাম পরিচালক। ভালদাই ডিসকাশন ক্লাব রাশিয়ান একটি নীতিনির্ধারণী আলোচনামঞ্চ
(লেখাটি আরটি ডট কমের সৌজন্যে)
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা। ছবি: রয়টার্স
কিছু মহলে আশাবাদ প্রকাশ করা হচ্ছে বটে, তারপরও বলা এখনই আগাম হয়ে যাবে যে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এরই মধ্যে থমকে গেছে বা সংকটটি খুব শিগগিরই আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার মাধ্যমে সমাধান হয়ে যাবে। পরিস্থিতি এখনো অস্থির এবং ইরান রাষ্ট্রের টিকে থাকাটা এখনো পরীক্ষার মুখে রয়েছে। তবুও এই প্রাথমিক পর্যায়েই সংঘাতটি আরও গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করছে–বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কী হবে। এটা বোঝা যাবে, যখন বৈশ্বিক আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তাদের সাম্প্রতিক প্রচেষ্টা শেষ হবে।
যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক রাজনীতি থেকে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে–এমন তো নয়। আমেরিকার পতনের যে সব কল্পচিত্র আঁকা হয়, তা মূলত কল্পনার জগতের বিষয়। রাশিয়া, চীন, ভারত এবং অন্যান্য প্রধান শক্তির জন্য আসল প্রশ্ন এটি নয় যে, যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক রাজনীতিতে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে যাবে কি না। বরং প্রশ্ন হলো, পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় সে কীভাবে নিজেকে মানিয়ে নেবে।
রাশিয়ার জন্য এই প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র এখনো পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী উপাদান, যার সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে একদিকে ঘনিষ্ঠ, অন্যদিকে সংঘাতপূর্ণ। ভূগোল ও ইতিহাস নিশ্চিত করে যে, আমাদের কৌশলগত হিসাব-নিকাশে সবসময়ই পশ্চিম ইউরোপ ও আমেরিকাকে বিবেচনায় নিতে হবে। অতএব রাশিয়াকে সতর্কভাবে ভাবতে হবে ভবিষ্যতের শক্তির ভারসাম্যে যুক্তরাষ্ট্রকে কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, যাতে তা আমাদের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
ইরানের ওপর সাম্প্রতিক হামলাকে ঘিরে যে ঘটনাগুলো ঘটছে, সেগুলো হয়তো একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করছে। এগুলো এমন এক বিশ্বে আমেরিকান শক্তির সীমা উন্মোচন করেছে, যে বিশ্ব আর একতরফা নেতৃত্ব মেনে নিতে প্রস্তুত নয়, কিংবা সক্ষমও নয়। ইরান কতদিন ধারাবাহিক সামরিক চাপ সহ্য করতে পারবে, বাইরের অংশীদারদের কাছ থেকে কতটা সহায়তা পাবে এবং ওয়াশিংটন নিজেই কতদিন এমন একটি অভিযান চালিয়ে যেতে প্রস্তুত থাকবে, যা ইতিমধ্যেই তার প্রাথমিক প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে–এসব প্রশ্ন এখনো অনিশ্চিত।
তবে যা ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান, তা হলো একটি পরস্পরবিরোধী চিত্র। ইসরায়েলের নেতৃত্ব সংঘাতকে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে নিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে মনে হচ্ছে। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের সদস্যরা ইরান রাষ্ট্রের টিকে যাওয়ার অপ্রত্যাশিত ক্ষমতায় ক্রমেই বিস্মিত ও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছেন। একই সময় অনেক মার্কিন মিত্রও এই সংঘাতের পরিণতি নিয়ে দৃশ্যত উদ্বিগ্ন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুদ্ধটি ইতিমধ্যেই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গুরুতর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। এই অর্থনৈতিক চাপগুলো ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে–কেন এমন গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে যে, ওয়াশিংটন নীরবে এমন মধ্যস্থতাকারী খুঁজছে, যারা তেহরানের সঙ্গে সংলাপের পথ খুলতে পারে। এই অস্থির পরিবেশে রাশিয়া ইরানের জনগণ ও রাষ্ট্রের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছে, যাদের তারা উসকানিহীন হামলার শিকার বলে মনে করে। একই সঙ্গে মস্কোকে এমন নীতি অনুসরণ করতে হবে, যা তার নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সামরিক শক্তি হিসেবে রাশিয়ার প্রধান উদ্বেগ হলো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় সামগ্রিক শক্তির ভারসাম্য এবং সেই ব্যবস্থার মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র যে বিশেষ স্থান অধিকার করে এসেছে, তা। এই অবস্থানটি বোঝাতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ব্যবহৃত একটি উপমা ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশ্ব রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ‘নিওপ্লাজম’ বা অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধি হিসেবে তুলনা করা যেতে পারে। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো এখানে এমন কোনো ‘টিউমার’-এর অস্তিত্ব নেই, যা পুরো ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে না। বরং এটি সেই ব্যবস্থার বিকাশের মধ্যেই একীভূত হয়ে যায় এবং একটি বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করে। বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে যুক্তরাষ্ট্র যে অসাধারণ অবস্থান অর্জন করেছিল, তা শুধু অপ্রতিরোধ্য শক্তির ফল ছিল না।
এটি ছিল খুব নির্দিষ্ট কিছু ঐতিহাসিক পরিস্থিতির ফল। পশ্চিম ইউরোপ দীর্ঘ যুদ্ধে ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত ছিল, চীন অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মধ্যে ছিল আর সোভিয়েত ইউনিয়ন তার কমিউনিস্ট শাসনে বিশ্বের বাকি অংশ থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন ছিল। এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রকে অসাধারণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নেতৃত্বের অবস্থান নিতে সুযোগ করে দেয়।
কিন্তু এই নেতৃত্ব কখনোই রোমান সাম্রাজ্য বা চেঙ্গিজ খানের সাম্রাজ্যের মতো ক্লাসিক সাম্রাজ্যবাদী বিজয়ের ফল ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের কোনো সিদ্ধান্তমূলক সামরিক বিজয়ের মাধ্যমে পরাজিত করেনি। বরং অন্য শক্তিগুলো যখন নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যায় ব্যস্ত ছিল, তখনই যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে শক্তিশালী অভিনেতা হিসেবে উঠে আসে। এই অর্থে আমেরিকা ছিল কাফেলার ‘শেষ উট’, যে হঠাৎ করে সামনে চলে আসে, যখন অন্যরা পিছিয়ে পড়ে।
কিন্তু আজ সেই ঐতিহাসিক পরিস্থিতি আর নেই, যা আমেরিকার আধিপত্যকে সম্ভব করেছিল। এখন আর এমন কোনো বাস্তব কারণ নেই যে, অন্য শক্তিগুলো পিছিয়ে থাকবে। ফলে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র হয়তো বিশ্ব রাজনীতিতে একটি বেশি ‘স্বাভাবিক’ অংশগ্রহণকারী হয়ে উঠবে, প্রভাবশালী শক্তি নয়। ইরান সংকট এই পরিবর্তনটি স্পষ্ট করে।
অসীম সম্পদ ও সামরিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র সহজে একটি বৃহৎ ও স্থিতিস্থাপক রাষ্ট্রকে দমন করতে পারে না–যদি না সংঘাত পারমাণবিক স্তরে পৌঁছে যায়, যা সব পক্ষের কাছেই অচিন্ত্যনীয়। এই অর্থে ইরানে ট্রাম্পের অভিযান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করতে পারে। এটি বিশ্বকে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, একচ্ছত্র মার্কিন আধিপত্যের যুগ পুনঃস্থাপনের প্রচেষ্টা অর্থহীন।
স্ট্যাচু অব লিবার্টি।
এই শিক্ষা শুধু অন্য দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়; এটি আমেরিকানদের নিজেদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাদের শেষ পর্যন্ত নিজেদের শক্তির সীমা মেনে নিতে হবে এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় একটি নতুন ভূমিকা নির্ধারণ করতে হবে।
তিন শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বৈশ্বিক রাজনীতিতে অংশগ্রহণকারী রাশিয়া এই সীমাবদ্ধতাগুলো ভালোভাবেই বোঝে। অন্য অধিকাংশ বড় শক্তিও তা বোঝে।
শুধু যুক্তরাষ্ট্রই কখনো প্রকৃত অর্থে এই সীমার মুখোমুখি হয়নি। এই কারণেই এখন যে কঠিন শিক্ষা নেওয়া হচ্ছে, তা শেষ পর্যন্ত উপকারী প্রমাণিত হতে পারে। একই সঙ্গে অতিরঞ্জিত বিপর্যয়বাদী চিন্তা এড়িয়ে চলাও গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকান আধিপত্য দুর্বল হলে তা অবধারিতভাবে বৈশ্বিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে–এই ধারণাটি মূলত বিদ্যমান ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য ব্যবহৃত একটি অলঙ্কারমূলক যুক্তি। আরও ভারসাম্যপূর্ণ একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা সম্ভব এবং অনেক দিক থেকে তা কাম্যও।
রাশিয়ার নিজস্ব ইতিহাসই এই বিষয়টি দেখায়। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সূচনালগ্ন থেকেই রাশিয়া প্রায়ই আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ককে নিজের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য পূরণের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।
১৮ ও ১৯ শতকে এই লক্ষ্যগুলো ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল ব্রিটেন-রাশিয়া প্রতিদ্বন্দ্বিতার সাথে। পরে রাশিয়া, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিমুখী সম্পর্ক আন্তর্জাতিক রাজনীতির বৃহত্তর গতিশীলতাকে প্রভাবিত করেছে। আজ নতুন বিন্যাস গড়ে উঠছে। ইউরোপ ও চীনের ওপর আমেরিকার চাপ অনিচ্ছাকৃতভাবে এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থার সৃষ্টি করতে পারে, যেখানে কোনো একক শক্তি অন্যদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করবে না। এমন একটি ফলাফল রাশিয়ার স্বার্থের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
বর্তমান অস্থিরতার সময় থেকে যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত গড়ে উঠবে, তা সম্ভবত আগের ব্যবস্থার তুলনায় অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় ও জটিল হবে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে যুদ্ধ ও সংকট জড়িত থাকতে পারে, কিন্তু এগুলো যেন মূল রূপান্তরকে আড়াল না করে। যদি বিশ্ব এই সমন্বয়ের সময়কালটি বিপর্যয়কর সংঘাত ছাড়া অতিক্রম করতে পারে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবেই থাকবে।
তবে তা এই কারণে নয় যে, বিশ্ব আমেরিকান নেতৃত্বের প্রয়োজন অনুভব করে; বরং এই কারণে যে, অন্য শক্তিগুলো তাদের নিজস্ব কৌশলগত হিসাব-নিকাশে যুক্তরাষ্ট্রকে অন্তর্ভুক্ত করে যাবে। ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় আমেরিকা গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। তবে অবশ্যই আগের মতো আর নয়।
লেখক: ভালদাই ডিসকাশন ক্লাবের প্রোগ্রাম পরিচালক। ভালদাই ডিসকাশন ক্লাব রাশিয়ান একটি নীতিনির্ধারণী আলোচনামঞ্চ