আওয়ামী রাষ্ট্রপতির মুখে বিএনপির প্রশংসা ও অমীমাংসিত মৌলিক প্রশ্ন

আওয়ামী রাষ্ট্রপতির মুখে বিএনপির প্রশংসা ও অমীমাংসিত মৌলিক প্রশ্ন
জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। ছবি: ফেসবুক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনটির যাত্রাটা শুরু হয়েছে নানা ঘটন-অঘটনের মধ্য দিয়ে। এই সংসদ অনেকগুলো রেকর্ড তৈরি করেছে। এখানে দুই তৃতীয়াংশেরও বেশি সংসদ সদস্য প্রথমবার সংসদে এসেছেন, এমনকি সংসদ নেতা ও বিরোধী দলের নেতাও এর বাইরে নন। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে নির্বাচিতদের বেশির ভাগ নবীন হলেও বয়সে তরুণ নন। আবার গত তিন দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে দ্বিদলীয় রাজনৈতিক মেরুকরণ চলছিল, এবারে তারও ব্যত্যয় ঘটেছে। রাজনীতির প্রধান দুই ধারা ছিল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। এবারে আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগীরা কোথাও নেই।

পূর্বতন অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে। ফলে রাজনৈতিক মেরুকরণটি হয়েছে একদা মিত্র বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। এই নির্বাচনে জামায়াত ৩১ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রধান বিরোধী দলের আসন অলঙ্কৃত করেছে, বিএনপি ও তাদের মিত্ররা মিলে সরকার গঠন করেছে ২১২টি আসন পেয়ে। বিএনপি এককভাবে পেয়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ ভোট। আসন সংখ্যা ২০৯।

সংসদের প্রথম দিন যেসব আনুষ্ঠানিতা হয়ে থাকে, এবারেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন যথাক্রমে সাত বারের এমপি হাফিজউদ্দিন আহমদ ও আইনজীবী কায়সার কামাল। এরপর দুই পক্ষের আলোচনা ও সমঝোতার ভিত্তিতে কার্যোপদেষ্টা কমিটি ও বিশেষ কমিটিসহ বেশ কয়েকটি কমিটি গঠিত হয়েছে। মন্ত্রণালয়ভিত্তিক কমিটি গঠিত না হওয়া পর্যন্ত এসব কমিটিই সংসদ পরিচালনার নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করবে। প্রথা অনুযায়ী বিগত সংসদ ও বর্তমান সংসদের মাঝমাঝি সময়ে যেসব সাবেক জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী ও বিশিষ্ট ব্যক্তি প্রয়াত হয়েছেন, তাদের স্মরণে শোক প্রস্তাব আনা হয়। এই শোক প্রস্তাবে জুলাই শহীদদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ আমলে যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত ব্যক্তিদের নামও আছে। এসব নিয়েও কোনো বিপত্তি দেখা দেয়নি। নাম প্রস্তাবের সঙ্গে সঙ্গে স্পিকার বিনাবাক্য ব্যয়ে তা গ্রহণ করেছেন।

তবে বিপত্তি দেখা গেল রাষ্ট্রপতি মো. শাহাবুদ্দিনের ভাষণ নিয়ে। বিরোধী দল জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি থেকে আগেই বলা হয়েছিল, তারা রাষ্ট্রপতির অপসারণ চায়, তার ভাষণ শুনতে চায় না। স্পিকার যখন রাষ্ট্রপতির ভাষণের ঘোষণা দিলেন, তখনই বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা বিভিন্ন প্লাকার্ড নিয়ে ‘না’ সূচক ধ্বনি দিতে থাকেন। তাদের প্লাকার্ডে লেখা ছিল ‘জুলাইয়ের শহীদদের সঙ্গে গাদ্দারি’ চলবে না। স্বৈরাচারের দোসর রাষ্ট্রপতির অপসারণ চাই।

অতীতেও রাষ্ট্রপতির ভাষণ বর্জনের উদাহরণ আছে। কিন্তু এবারে যেটি দেশবাসীর কাছে কষ্টদায়ক ছিল, তা হলো জাতীয় সঙ্গীত বাজানোর সময় বিরোধী দলের অনেক সদস্যের আসনে বসে থাকা। তার প্রতি যথাযথ সম্মান না দেখানো।

আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রপতি হিসেবে পরিচিত মো. শাহাবুদ্দিন যেই ভাষণ জাতীয় সংসদে দিলেন, সেটা ছিল বিএনপি সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ অনুমোদিত। ফলে এই ভাষণে তিনি বিএনপি সরকারের ভূয়সী প্রশংসা আছে, আছে আওয়ামী লীগের কঠোর সমালোচনা। রাষ্ট্রপতি আওয়ামী লীগকে ফ্যাসিস্ট দল ও আওয়ামী লীগ শাসনকে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ান বলে অভিহিত করেছেন। তিনি হাজারো প্রাণের বিনিময়ে গণতন্ত্রের অভিযাত্রা শুরু হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক জিয়াউর রহমানের নাম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বা অন্য কোনো নেতার নাম বলেনি। তার ভাষায়, তারা হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখাকারী সকল নেতা।

অথচ এই রাষ্ট্রপতি ২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী ভাষণে বিএনপি ও এর সহযোগীদের ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, আন্দোলনের নামে কেউ যাতে অরাজকতা সৃষ্টি করে মানুষের জানমাল ও জীবিকার ক্ষতিসাধন না করতে পারে, সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। সেবারে তিনি আওয়ামী লীগ সরকার লিখিত ১৪৩ পাতার ভাষণের সংক্ষিপ্তসার উপস্থাপন করেছিলেন, এবারে বিএনপির সরকারেরর লিখিত ভাষণ পাঠ করলেন। সেবারে তিনি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু বলে অভিহিত করে ষড়যন্ত্র ও গুজব রটনাকারীদের সম্পর্কে সজাগ থাকতে বলেছিলেন দেশবাসীকে।

মো. সাহাবুদ্দিন। ফাইল ছবি
মো. সাহাবুদ্দিন। ফাইল ছবি

রাষ্ট্রপতি পদটি সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক। এই পদে যারা আসীন হন তাদেরও সেই মর্যাদা ও সম্মান নিয়ে থাকা উচিত। কিন্তু আমাদের দেশে রাষ্ট্রপতি পদটিকে বরাবর আজ্ঞাবহ করে রাখা হয়েছে বিভিন্ন সরকারের আমলে। আমরা মনে করি, রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে জাতীয় সংসদে সরকারি দল বা সরকারের লিখিত ভাষণ পড়ানোর রীতি বদলানো উচিত। তিনি কোনো দল থেকে নির্বাচিত হলেও রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর দলীয় থাকেন না। কিন্তু বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ ছাড়া আর কোনো রাষ্ট্রপতি স্বীয় সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার চেষ্টা করেননি। তিনিও সংসদে সরকারি দলের লিখিত ভাষণ পড়ার পাশাপাশি নিজের বক্তব্যও তুলে ধরতেন।

জুলাই সনদে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সংসদের প্রথম অধিবেশনে যারা রাষ্ট্রপতির ভাষণ বর্জন করেছেন, তারা কেউ সরকারি দলের লিখিত ভাষণ নিয়ে প্রশ্ন করেননি। প্রশ্ন করেছেন, স্বৈরাচারের দোসর রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে। ভবিষ্যতে যদি বিএনপি দলীয় রাষ্ট্রপতি আসেন তাকে দিয়েও একই কাজ করানো হবে।

রাষ্ট্রপতির ভাষণ ছাড়া যেসব মৌলিক বিষয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে বিরোধ আছে, সেগুলো কীভাবে সুরাহা হবে তার ইঙ্গিত পাওয়া গেল না সংসদের প্রথম অধিবেশনে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিস্তর ফারাক আছে। সরকারি দল বলছে আপত্তিসহ তারা জুলাই সনদে সই করেছেন। আর জনগণ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের পক্ষে রায় দিয়েছেন। ফলে এর বাইরের কিছু গ্রহণ করা তাদের পক্ষ সম্ভব নয়। অন্যদিকে বিরোধী দলের দাবি, জুলাই সনদের ভিত্তিতে যে সাংবিধানিক আদেশ হয়েছে,তার পুরোটা বাস্তবায়ন করতে হবে। কেননা গণভোটের মাধ্যমে জণগণ জুলাই সনদকে দাঁড়ি কমাসহ গ্রহণ করেছে। এখানে কোনো হাঙ্কিপাঙ্কি চলবে না।

প্রথম অধিবেশনে সংসদ নেতা তারেক রহমান ও বিরোধী দলের নেতা শফিকুর রহমান দুজনই পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছেন। সংসদ কার্যকর ও প্রাণবন্ত করার কথা বলেছেন। কিন্তু মৌলিক বিষয়ের সমাধান না হলে সেটি সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। সরকারি দল বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকারের পদ দিতে চেয়েছিল। কিন্তু বিরোধী দল সেটি গ্রহণ না করায় স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার দুটোই সরকারি দল থেকে নেওয়া হলো। বিরোধী দল বলেছে, তারা শুধু একটি পদ নিতে আগ্রহী নয়। জুলাই সনদের পুরো প্যাকেজ বাস্তবায়নে আগ্রহী। এখন দেখা যাক দুই পক্ষের যুক্তিতর্ক কোথায় গিয়ে ঠেকে।

লেখক: সম্পাদক, চরচা

সম্পর্কিত