পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কাছে বড় ব্যবধানে হেরে গেছে টানা তিনবার ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেস। এমনকি দলের সভানেত্রী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও তার নিজ আসনে হেরে গেছেন। এর মধ্য দিয়ে নতুন এক রাজনৈতিক মোড় দেখা গেলে ওপার বাংলায়। তাতে বিজেপিই আসলে মূল কারিগর। এখন তাহলে মমতার কী হবে?
একসময় মনে করা হতো, পশ্চিমবঙ্গের মসনত থেকে বামদের হটানো যাবে না। সেই ‘প্রায় অসম্ভব’ কাজকেই সম্ভব করেছিলেন রাজপথের লড়াকু নেত্রী মমতা। এবার তার ভরাডুবি হলো বেশ বাজেভাবেই। এই হারের পর মমতার সেই সংগ্রামী যাত্রা ফিরে আসবে কি? নাকি তিনি মিলিয়ে যাবেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে।
এসব প্রশ্ন নিয়ে একটি বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
বিবিসি বলছে, গত ১৫ বছর ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তার দল তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির একটি অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন–যেভাবেই হোক, তারা টিকে থাকার পথ খুঁজে নিতেন।
গত সোমবার সেই ধারার অবসান ঘটল।
মমতার এই পরাজয় ভারতের সমসাময়িক রাজনীতির এক উল্লেখযোগ্য ক্যারিয়ারকে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। যে পথ চলা শুরু হয়েছিল রাজপথের আন্দোলন দিয়ে, তার পরিণতি হলো তার নিজের হাতে গড়া রাজনৈতিক দুর্গের পতনের মধ্য দিয়ে।
ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কাছে এবারের অগ্নিপরীক্ষায় হার মানতে হয়েছে এই জননেত্রীকে। ফলে টানা চতুর্থবার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তা শেষ হয়ে গেল। এই জয় পেলে তিনি জ্যোতি বসু বা নবীন পট্টনায়েকের মতো দীর্ঘমেয়াদী জননেতাদের তালিকায় জায়গা করে নিতেন।
মমতার এই পরাজয় ভারতের সমসাময়িক রাজনীতির এক উল্লেখযোগ্য ক্যারিয়ারকে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। যে পথ চলা শুরু হয়েছিল রাজপথের আন্দোলন দিয়ে, তার পরিণতি হলো তার নিজের হাতে গড়া রাজনৈতিক দুর্গের পতনের মধ্য দিয়ে।
সাধারণ সুতির শাড়ি আর রবার চটি পরা এই ছোটখাটো মানুষটিকে দেখে কখনোই মনে হয়নি, তিনি বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ মেয়াদী নির্বাচিত কমিউনিস্ট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারেন। অথচ ২০১১ সালে তিনি টানা ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সরকারকে পরাজিত করেছিলেন, যা গোটা পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রকে বদলে দিয়েছিল। এক সময় ভারতের প্রজ্ঞা ও ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত পশ্চিমবঙ্গ যখন শিল্পায়ন ও রাজনীতির স্থবিরতায় ভুগছিল, তখন ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’ তাকে ‘নিজেদের বার্লিন দেওয়াল ভেঙে ফেলার হাতিয়ার’ হিসেবে বর্ণনা করেছিল। ওই সময় ‘টাইম’ ম্যাগাজিন তাকে বিশ্বের ১০০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় স্থান দেয়।
মমতার উত্থান হয়েছিল বাংলার লড়াকু রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে, যেখানে নির্বাচন মানেই যেন রাজপথের যুদ্ধ। তার সমর্থকরা তাকে ‘অগ্নির দেবী’ বলে ডাকতেন। কলকাতার এক নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া মমতা ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমেই কংগ্রেসে যোগ দেন। আশির দশকে তিনি বাম বিরোধিতার প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন এবং পরে কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেন।
রাস্তায় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: ফেসবুকবাংলার রাজনীতির সংঘাত মমতার জীবনকেও প্রভাবিত করেছে। ১৯৯০ সালে এক মিছিলে সিপিএম ক্যাডারদের হামলায় তার মাথা ফেটে যায় এবং তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। এই ঘটনাই তাকে একাধারে লড়াকু এবং ত্যাগী নেত্রীর প্রতিচ্ছবি হিসেবে গড়ে তোলে। ক্ষমতায় থাকার সময়ও তিনি নিজেকে একজন বিদ্রোহী হিসেবেই তুলে ধরতেন।
২০০৭ সালে সিঙ্গুরে টাটা মোটরসের কারখানা এবং নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে আন্দোলন মমতার উত্থানকে আরও ত্বরান্বিত করে। নিজেকে কৃষকদের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরে তিনি গ্রামবাংলার দরিদ্র মানুষের মন জয় করেন। তবে এই আন্দোলনের ফলে শহরের মধ্যবিত্ত ও ব্যবসায়ীরা তার থেকে দূরে সরে যান। কারণ তারা মনে করেছিলেন, মমতা বাংলা থেকে বিনিয়োগ সরিয়ে দিচ্ছেন।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের নৃবিজ্ঞানী মুকুলিকা বন্দ্যোপাধ্যায় বিবিসিকে বলেন, “মমতা নরেন্দ্র মোদির মতোই সারাজীবন রাজনীতি করেছেন। তার প্রতিপক্ষ ছিল শিক্ষিত, উচ্চবর্ণের কমিউনিস্ট পুরুষরা (ভদ্রলোক), যারা তার গায়ের রং বা চলন-বলনকে তাচ্ছিল্য করত।”
সবাই তাকে ‘দিদি’ বলে ডাকতেন। কারণ তিনি এমন এক ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছিলেন, যিনি মানুষের জন্য প্রাণ দিতেও প্রস্তুত।
মুকুলিকা আরও বলেন, “প্রথম দিকের সেই লড়াইগুলো মমতাকে সাহসী করে তুলেছিল। সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি তাদেরও সাহসী করতে শিখেছিলেন।”
সবাই তাকে ‘দিদি’ বলে ডাকতেন। কারণ তিনি এমন এক ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছিলেন, যিনি মানুষের জন্য প্রাণ দিতেও প্রস্তুত।
ভারতের অধিকাংশ নারী রাজনীতিকের মতো মমতার পেছনে কোনো শক্তিশালী পরিবার বা মেন্টর ছিল না। মুকুলিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, মমতা নিজেই দল গড়ে অপরাজেয় কমিউনিস্টদের হারিয়েছেন এবং তিন মেয়াদে ক্ষমতায় ছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি অন্য নারীদেরও রাজনীতিতে এগিয়ে এনেছেন (এবারের নির্বাচনে তার দল ৫২ জন নারী প্রার্থী দিয়েছিল)।
বহু বছর ধরে মমতার ব্যক্তিগত ক্যারিশমা, নারীদের জন্য কল্যাণমূলক প্রকল্প এবং আঞ্চলিক আবেগ দুর্নীতি ও বিজেপির উত্থানকে ঠেকিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা দিয়ে চিরকাল শাসন চালানো যায় না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য একসময় বলেছিলেন, বাম আমলে পশ্চিমবঙ্গ ছিল একটি ‘পার্টি সোসাইটি’, যেখানে জীবনের প্রতিটি স্তরে পার্টি বা দল জড়িয়ে ছিল। মমতার দল এই কাঠামোটি গ্রহণ করলেও সেখানে নিজের ব্যক্তিগত প্রভাব খাটাতেন। তিনি একে একটি ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল’ হিসেবে চালাতেন, যেখানে স্থানীয় নেতাদের আনুগত্যের বিনিময়ে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেওয়া হতো।
তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: রয়টার্স২০২৩ সালেই দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য আশঙ্কা করেছিলেন, এই মডেল তৃণমূলকে দুর্বল করে দিচ্ছে। নেতাদের ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার লোভ দলের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দূরত্ব তৈরি করছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয় রাজ্যের আর্থিক সংকট, বেকারত্ব, শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি এবং নারী নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ।
এবারের এই পরাজয়ের পর মমতার সামনে এখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। বাংলার রাজনীতির ইতিহাস বলে, শাসক দল হারলে নেতা-কর্মীরা দ্রুত নতুন ক্ষমতার দিকে ঝুঁকে পড়ে। বিশ্লেষক সায়ন্তন ঘোষ মনে করেন, তৃণমূলের অনেক নেতা বিজেপিতে চলে যেতে পারেন, যার ফলে দলে ভাঙন দেখা দিতে পারে।
৭১ বছর বয়সী মমতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখনই শেষ বলা হয়তো ঠিক হবে নাG তবে এই পরাজয় আগের সংকটের চেয়ে অনেক বড়। সোমবারের ফলাফল বলছে, মোদির বিজেপির একাধিপত্যের সামনে লড়াই করা এখন আগের মতো সহজ নয়।
মমতা কি পারবেন আবার সেই আগের মতো রাজপথের লড়াকু নেত্রী হয়ে ফিরে আসতে? নাকি তিনি পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার এক স্মৃতি হয়ে থেকে যাবেন? সোমবার মমতা কলকাতার ভবানীপুর কেন্দ্র থেকেও পরাজিত হয়েছেন।
মমতা নিজেই মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি আবার রাজপথে ফিরছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আমি এখন এক মুক্ত পাখি, একজন সাধারণ মানুষ। আমার কাছে আর কোনো চেয়ার নেই।”
তিনি বিরোধী ইন্ডিয়া জোটকে শক্তিশালী করার অঙ্গীকার করেছেন।
নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে মমতা বলেন, “আমরা হারিনি, আমাদের থেকে জয় ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।” সবশেষে তিনি সেই চিরপরিচিত ঢঙে বললেন, “আমি যেকোনো জায়গা থেকে লড়াই করতে পারি। তাই এবার আমাকে আবার রাজপথেই দেখা যাবে।”